১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি , এয়ারবাস প্রস্তাব স্থগিত: ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েনের শঙ্কা।

এভিয়েশন প্রতিবেদক, ঢাকা | ৩ মে ২০২৬
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে নতুন ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে সরকার। ওয়াইডবডি ও ন্যারোবডি মিলিয়ে এই উড়োজাহাজগুলো পর্যায়ক্রমে বহরে যুক্ত হবে। এর ফলে ২০২৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁর ঢাকা সফরের সময় ১০টি এয়ারবাস এ৩৫০ কেনার যে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছিল, তা কার্যত স্থগিত হয়ে গেল। সফরের দ্বিতীয় দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক শেষে মাক্রোঁ বলেছিলেন, “ইউরোপীয় এভিয়েশন শিল্পে আস্থা রাখার জন্য ধন্যবাদ। ১০টি এয়ারবাস এ৩৫০-এর প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ।” তখন বেসামরিক বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী জানিয়েছিলেন, বহরে শুধু বোয়িং থাকায় কৌশলগত ঝুঁকি কমাতে এয়ারবাস যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কারণ প্রতিটি দেশই সাধারণত বহরে এয়ারবাস ও বোয়িং দুটোই রাখে।
বর্তমানে বিমানের বহরে ২০টির বেশি উড়োজাহাজের সবই বোয়িংয়ের তৈরি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নতুন করে এয়ারবাস নিলে পাইলট প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও স্পেয়ার পার্টসের জন্য আলাদা অবকাঠামো তৈরি করতে হবে, যা ছোট বহরের জন্য ব্যয়বহুল। অন্যদিকে বোয়িং নিলে বিদ্যমান ক্রু ও টেকনিক্যাল সেটআপই ব্যবহার করা সম্ভব। তবে এভিয়েশন বিশ্লেষকরা বলছেন, এয়ারবাসের জ্বালানি সাশ্রয় বেশি এবং দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ তুলনামূলক কম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বোয়িংয়ের একাধিক মডেলে কারিগরি ত্রুটি ও দুর্ঘটনার কারণে বৈশ্বিক বাজারে অনাস্থা তৈরি হয়েছে এবং অনেক দেশ অর্ডার বাতিল করেছে। একক নির্মাতার ওপর শতভাগ নির্ভরতাকে তাই কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দরকষাকষির ক্ষমতা কমাবে এবং যন্ত্রাংশ সংকটে পুরো বহর অচল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।

এয়ারবাস চুক্তি স্থগিত হওয়ায় কূটনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গত মার্চে ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে বৈঠকে এয়ারবাস কেনার বিষয়ে আবারও গুরুত্ব দেন। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতরা যৌথভাবে বিমানকে বহর বহুমুখী করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ফরাসি প্রস্তাবে রপ্তানি ঋণ সহায়তার মাধ্যমে ৮৫% পর্যন্ত অর্থায়নের কথাও উল্লেখ ছিল। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এয়ারবাস প্রস্তাব থেকে সরে আসায় ফ্রান্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে ফরাসি বিনিয়োগ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

বোয়িংয়ের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা এই চুক্তি চূড়ান্ত করতে ভূমিকা রেখেছে বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা আছে। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের নামও এ প্রসঙ্গে উঠে এসেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে কারিগরি ও বাণিজ্যিক বাস্তবতা বিবেচনায়। ১৪টি বোয়িং কবে নাগাদ ডেলিভারি হবে এবং অর্থায়ন কীভাবে হবে, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। এয়ারবাসের প্রস্তাব পুরোপুরি বাতিল না ‘স্থগিত’ রাখা হয়েছে, সে বিষয়েও সরকারের কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই।

এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চুক্তি হয়ে যাওয়ায় এখন দ্রুত ডেলিভারি নিশ্চিত করা ও সুষ্ঠু পরিচালনাই বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে ইউরোপের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু বোয়িং বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেকেই বাণিজ্যিক বিষয়ের পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url