ইউনুস পরবর্তী বাস্তবতা: যে অর্থনৈতিক বোঝা বিএনপির পথকে কঠিন করে তুলতে পারে।


বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের ক্ষমতার ভার এখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র হাতে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রামের পর এই ক্ষমতা অর্জন তাদের জন্য যেমন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, তেমনি এটি একটি কঠিন বাস্তবতার সূচনা। কারণ, ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তারা এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে, যা ইতোমধ্যেই চাপ ও অনিশ্চয়তায় ভারাক্রান্ত।
বিশেষ করে, উপদেষ্টা সরকারের সময়ে মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে নেওয়া বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সমালোচকদের একটি অংশের মতে, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই নীতিগুলোর ফলে বৈদেশিক নির্ভরতা বেড়েছে এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
বাংলাদেশ-এর অর্থনীতি এমনিতেই মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, এবং বিনিয়োগের ধীরগতির মতো সমস্যার মুখোমুখি। এর ওপর নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পূর্ববর্তী সময়ে গৃহীত অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং আর্থিক দায়বদ্ধতা সামাল দেওয়া। এসব সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন নতুন সরকারের ওপর এসে পড়েছে, যা তাদের নীতি বাস্তবায়নের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়েছে। একদিকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা, অন্যদিকে একটি চাপপূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করা। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা—এসবই এখন তাদের জন্য অপরিহার্য লক্ষ্য। কিন্তু পূর্ববর্তী সময়ে নেওয়া কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন।
বিএনপির জন্য এই বাস্তবতা একটি রাজনৈতিক পরীক্ষাও বটে। কারণ, জনগণ এখন ফলাফল দেখতে চায়। তারা জানতে চায়, নতুন নেতৃত্ব কি সত্যিই অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারবে, নাকি পূর্ববর্তী সময়ের সিদ্ধান্তের প্রভাব তাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, ক্ষমতায় আসা যতটা কঠিন, ক্ষমতায় থেকে সংকট মোকাবিলা করা তার চেয়েও কঠিন। ইউনুস পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা এখন বিএনপির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে শুধু অর্থনীতি নয়, রাজনৈতিকভাবেও তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
সামনের দিনগুলো তাই শুধু একটি সরকারের জন্য নয়, বরং একটি দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। এখন দেখার বিষয়—বিএনপি এই কঠিন বাস্তবতাকে কাটিয়ে উঠতে পারে, নাকি এই বোঝাই তাদের পথকে আরও কঠিন করে তুলবে।
Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url