ফ্রান্সের পৌর নির্বাচনে বাংলাদেশি তরুন নাহিদুলের ঐতিহাসিক জয়।


ফ্রান্সের ২০২৬ সালের পৌর নির্বাচনে এক গর্বের ইতিহাস রচনা করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ নাহিদুল মোহাম্মদ। উত্তর প্যারিসের উপশহর সাঁ-দনি থেকে অতি বামপন্থি রাজনৈতিক দল লা ফ্রঁস আঁসুমিজ (এলএফআই)-এর প্যানেল থেকে প্রার্থী হয়ে তিনি প্রথম দফাতেই নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেন। তার প্যানেল ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে সরাসরি জয় নিশ্চিত করায় দ্বিতীয় দফার ভোটের প্রয়োজন পড়েনি—যা স্থানীয় রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করছে।


নাহিদুল মোহাম্মদের পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলায়। তিনি প্যারিসের সর্বন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। তার এই রাজনৈতিক সাফল্যের পেছনে পারিবারিক অনুপ্রেরণাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার বাবা, জনাব নুরুল আবেদীন, ফ্রান্স আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠিত ও নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই নাহিদুল রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন।

গত রবিবার (১৫ মার্চ) অনুষ্ঠিত ফ্রান্সের পৌর নির্বাচনের প্রথম দফায় দেশজুড়ে প্রায় ৩৪ হাজার ৮৭৫টি কমিউন বা শহরে ভোটগ্রহণ হয়। প্রায় ৫৬ শতাংশ ভোটার এতে অংশ নেন। এই হার ২০২০ সালের তুলনায় বেশি হলেও ২০১৪ সালের তুলনায় কিছুটা কম।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে ফ্রান্সের রাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। অতি বামপন্থি এলএফআই এবং কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র‍্যালি (আরএন) বিভিন্ন শহরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে।

রাজধানী প্যারিসে সোশ্যালিস্ট প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও ডানপন্থি ও বামপন্থি শক্তির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে। এলএফআই-এর প্রার্থী তৃতীয় অবস্থানে থেকে বামপন্থি ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন, যা দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

লিয়োঁ শহরে বর্তমান মেয়র ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী সমান ভোট পেয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করছেন। মার্সেই শহরে বর্তমান মেয়র সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন কট্টর ডানপন্থি প্রার্থীর বিরুদ্ধে। অন্যদিকে লিল শহরেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ তীব্র, যেখানে বামপন্থি ও পরিবেশবাদী দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে।

জঁ-লুক মেলনশোঁর নেতৃত্বাধীন এলএফআই দলটি এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। উত্তর ফ্রান্সের রুবে শহরে দলটির প্রার্থী বড় ব্যবধানে এগিয়ে থেকে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে ফ্রান্সের রাজনীতিতে বামপন্থি শক্তি নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে।

নাহিদুল মোহাম্মদের এই বিজয় শুধুমাত্র একটি নির্বাচনী ফল নয়—এটি ফ্রান্সে বসবাসরত অভিবাসী বংশোদ্ভূত তরুণদের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা। তাদের অংশগ্রহণ এখন আর সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা মূলধারার রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে।

তার বক্তব্যে উঠে এসেছে আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যতের আশা—এই বিজয় স্থানীয় সমাজে বাংলাদেশি কমিউনিটির উপস্থিতিকে আরও দৃশ্যমান করবে এবং নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিতে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করবে।

নাহিদুল মোহাম্মদের সাফল্য প্রমাণ করে—পরিশ্রম, শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা থাকলে অভিবাসী পটভূমি কখনোই বাধা নয়। বরং তা হয়ে উঠতে পারে শক্তির উৎস। তার এই অর্জন শুধু ফ্রান্স নয়, বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্যও এক অনুপ্রেরণার প্রতীক।প্রবাসে বেড়ে ওঠা এক তরুণের এই বিজয় দেখিয়ে দিল—স্বপ্ন, সংগ্রাম ও নেতৃত্বের সমন্বয় থাকলে আন্তর্জাতিক পরিসরেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। নাহিদুল মোহাম্মদ আজ সেই সম্ভাবনারই উজ্জ্বল উদাহরণ।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url