দক্ষিণ সুরমায় বড় ভাগা নদীর পানি দূষণ: তীব্র দুর্গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে হাজারো মানুষ—

নিজস্ব প্রতিবেদক, নাদিম মাহমুদ দক্ষিণ সুরমা (সিলেট):
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বড় ভাগা নদী আজ মারাত্মক দূষণের কবলে পড়েছে। নদীর পানিতে অস্বাভাবিক কালচে রঙ ও তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে, যা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ছবি-জেমিনি 
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতি বছর একই সময়ে নদীর পানি হঠাৎ করেই দূষিত হয়ে যায় এবং কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত এই অবস্থা বিরাজ করে। এতে করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে।
এলাকার বাসিন্দা মোঃ আব্দুল করিম বলেন,
“বর্ষা শুরু হলেই আমরা এক ধরনের আতঙ্কে থাকি। নদীর পানি কালো হয়ে যায়, এমন গন্ধ বের হয় যে ঘরের বাইরে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে। এটা নতুন কিছু না—বছরের পর বছর ধরে চলছে।”
স্থানীয় মৎস্যজীবী মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন,
“এই নদীই ছিল আমাদের জীবিকার প্রধান উৎস। কিন্তু এখন মাছ তো পাওয়াই যায় না, উল্টো পানিতে নামলেই শরীরে চুলকানি আর জ্বালাপোড়া শুরু হয়। আমরা এখন চরম বিপদের মধ্যে আছি। যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, তাহলে আমাদের পেশা ছেড়ে দিতে হবে।”
স্থানীয়দের দৃঢ় সন্দেহ, আশপাশের কয়েকটি জনপ্রিয় বেকারি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বর্জ্য পদার্থ গোপনে সংরক্ষণ করে রাখে এবং বর্ষার প্রথম দিকে তা নদীতে ছেড়ে দেয়। এতে করে নদীর পানি হঠাৎ করেই দূষিত হয়ে পড়ে এবং পরিবেশে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, তবে বিষয়টি দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
পরিবেশ সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য নিঃসরণ শুধু নদীর পানিকেই দূষিত করে না, বরং জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে পুরো বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। একই সঙ্গে এই দূষিত পানি ব্যবহার করার ফলে স্থানীয়দের মধ্যে চর্মরোগ, ডায়রিয়া, জ্বরসহ বিভিন্ন রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাচ্ছে।

 উপজেলা প্রশাসনের প্রতি জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ
দক্ষিণ সুরমা উপজেলা প্রশাসনের প্রতি এলাকাবাসীর জোরালো আহ্বান—এই গুরুতর পরিবেশগত সংকট আর অবহেলার মধ্যে ফেলে রাখা যাবে না। বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যা পুনরাবৃত্তি হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসী মনে করেন, প্রশাসনের সামান্য আন্তরিকতা ও নিয়মিত মনিটরিং থাকলে এই ধরনের দূষণ সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিষয়টি যেন অদৃশ্য কোনো কারণে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে, যা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
তাই জরুরি ভিত্তিতে উপজেলা প্রশাসনের কাছে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানানো হচ্ছে—
* বড় ভাগা নদীর পানির নমুনা সংগ্রহ করে দ্রুত ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থা করা
* সম্ভাব্য দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করে তদন্ত কমিটি গঠন করা
*অবৈধভাবে বর্জ্য নিঃসরণে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা
*নদী ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত পরিবেশ মনিটরিং চালু করা
*স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জরুরি মেডিকেল ক্যাম্পের ব্যবস্থা করা
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, “এটি শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট”—তাই দ্রুত এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

 জনপ্রতিনিধির হস্তক্ষেপ কামনা
এছাড়াও সিলেট-৩ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এলাকাবাসী। তারা আশা করছেন, বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা প্রদান করবেন এবং এলাকাবাসীকে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।
 বড় ভাগা নদীর এই দূষণ শুধু একটি মৌসুমি সমস্যা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও নজরদারির অভাবের ফল। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ হতে পারে।
Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url