ফ্রান্সে নজির বিহীন সহিংসতা, সিটি হলে আগুন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট প্যারিস, লিঁও, মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে উত্তেজনা; ১২০০ জনের বেশি গ্রেপ্তার, আহত ১৫০ পুলিশ সদস্য।


নিজস্ব প্রতিবেদক | আজকের বাংলা খবর
প্যারিস, ১৮ অক্টোবর ২০২৬: জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং শিক্ষা ও জনসেবা খাতের সংকটকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানী প্যারিসসহ লিঁও, মার্সেই, লিমোজ ও বোর্দোর মতো বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের একপর্যায়ে সরকারি স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফরাসি সরকারের দেওয়া প্রাথমিক হিসাব অনুসারে, দেশজুড়ে সংঘটিত এসব ঘটনায় ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১৫০ জন পুলিশ ও জেনদারমেরি সদস্য। তবে সহিংসতার পাশাপাশি দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক মানুষ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভেও অংশ নেন। 

লিমোজে সিটি হলে অগ্নিকাণ্ড, বিভিন্ন শহরে সরকারি স্থাপনায় হামলা
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে সরকারি ও প্রশাসনিক স্থাপনা হামলার শিকার হয়েছে। সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে লিমোজ শহরে। সেখানে ঐতিহাসিক সিটি হলে আগুন লাগার পর ভবনটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এদিকে মার্সেইয়ের সিটি হলে বিক্ষোভকারীদের একটি দল প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায়। লিঁও শহরে কেন্দ্রীয় এলাকার পর্যটন কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। লিলসহ অন্যান্য শহরেও সরকারি ভবন ও প্রশাসনিক স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে।
এসব ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাট, ক্ষতির মুখে ব্যবসায়ীরা
বিক্ষোভের একপর্যায়ে প্যারিস, মার্সেই, লিঁও, লিল ও নিসসহ বিভিন্ন শহরে দোকানপাট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ভাঙচুরের শিকার হয় বিভিন্ন খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সুপারমার্কেট।
প্যারিসের বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় দোকানের কাচ ভাঙা ও পণ্য লুটের খবর পাওয়া গেছে। লিলসহ কয়েকটি শহরে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জনজীবন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
তবে নির্দিষ্ট কোনো ব্র্যান্ডের প্রতিটি দোকানে হামলা বা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে—এমন দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট ঘটনার পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। 
গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
প্যারিসের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ চলাকালে গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। লিঁও ও অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু শনিবার রাতে জানান, সহিংসতার ঘটনায় ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রায় ১৫০ জন পুলিশ ও জেনদারমেরি সদস্য আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতা ও সরকারি স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার। 

ফ্রান্সে চলমান আন্দোলনের পেছনে রয়েছে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে উদ্বেগ আন্দোলনের অন্যতম কারণ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষকস্বল্পতা এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত সহায়তার দাবিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদও এই আন্দোলনের বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে। পরবর্তী সময়ে শ্রমিক, বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য এবং সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণে বিক্ষোভ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে।
কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অন্যদিকে, আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ। এই পার্থক্য থেকে স্পষ্ট যে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি হিসাব ও আয়োজকদের দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।
সহিংসতার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পরিচ্ছন্নতা ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকারি স্থাপনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে।
সরকার একদিকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর অধিকারকে স্বীকার করেছে, অন্যদিকে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
ফ্রান্সে চলমান এই পরিস্থিতি দেশটির অর্থনৈতিক চাপ, শিক্ষা খাতের সমস্যা এবং জনসেবার মান নিয়ে মানুষের অসন্তোষকে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী মানুষের দাবি এবং সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের কার্যকলাপকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ এবং সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url