পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ভূমিকম্প: নবান্নের পথে বিজেপি, তিস্তা চুক্তিতে নতুন আশা নাকি CAA-র নতুন শঙ্কা?


কলকাতা থেকে  সন্দা ব্যানার্জী, ৪ মে ২০২৬

প্রধান খবর: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক পালাবদল ঘটতে চলেছে। আজ সোমবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া ভোটগণনার প্রাথমিক ফলে ভারতীয় জনতা পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেরিয়ে গেছে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবার এবং স্বাধীনতার পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে বাম-তৃণমূলের বাইরে কোনও দল সরকার গঠন করতে চলেছে।
ভোটগণনার সর্বশেষ চিত্র  
রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে আজ গণনা চলছে। ফলতা কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থীর আকস্মিক মৃত্যুর কারণে সেখানে পুনর্নির্বাচন হবে।

নির্বাচন কমিশনের সূত্র ও জাতীয় গণমাধ্যমের লাইভ আপডেট অনুযায়ী, সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া ট্রেন্ড:  
• ভারতীয় জনতা পার্টি: প্রায় ১৮৮টি আসনে এগিয়ে/জয়ী • তৃণমূল কংগ্রেস: প্রায় ৯৪টি আসনে এগিয়ে/জয়ী • বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোট: বাকি আসনগুলোতে এগিয়ে 
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাজিক ফিগার ১৪৮। বিজেপি সেই সংখ্যা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। হাওড়া, উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে পদ্মশিবিরের বিপুল দাপট দেখা গেছে। অন্যদিকে দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলায় তৃণমূল লড়াই ধরে রেখেছে।

হেভিওয়েট কেন্দ্র: ভবানীপুরে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নন্দীগ্রামে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী নিজ নিজ আসনে জয়ের পথে। তবে দলের সামগ্রিক ফলাফলে এর প্রভাব পড়ছে না।
কেন এই পালাবদল গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য?  
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান সবসময়ই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম নিয়ামক। এবারের ফলাফল বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য ‘মিশ্র’ বার্তা বয়ে এনেছে।
১. তিস্তা চুক্তি: দেড় দশকের জট খোলার সম্ভাবনা  
২০১১ সাল থেকে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি আটকে আছে মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে। তিনি উত্তরবঙ্গের কৃষকদের স্বার্থের কথা বলে কেন্দ্রের খসড়া চুক্তিতে সই করেননি।

এবার কেন্দ্র ও রাজ্যে বিজেপি সরকার – অর্থাৎ ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার হলে সেই বাধা কেটে যাবে। দিল্লির সাউথ ব্লক সূত্র বলছে, নতুন সরকার গঠনের পরেই তিস্তা চুক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের জন্য বড় কূটনৈতিক বিজয় হতে পারে।

কিন্তু চ্যালেঞ্জও আছে: বিজেপির উত্তরবঙ্গের বিধায়করাও ভোটের রাজনীতির কারণে চুক্তির বিরোধিতা করতে পারেন। তাই নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে রাজ্যের কৃষকদের বোঝানোর কঠিন কাজটি করতে হবে।
২. CAA-NRC ও সীমান্ত ইস্যু: নতুন উদ্বেগ  
বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পশ্চিমবঙ্গে CAA বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুতে দলটির কড়া অবস্থান বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিরোধী দল BNP-জামায়াত ভারত-বিরোধী প্রচারণা জোরদার করতে পারে। এটি আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য কূটনৈতিক অস্বস্তির কারণ হবে।
৩. গঙ্গা চুক্তি ও বাণিজ্য  
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ২০২৬ সালেই নবায়ন হওয়ার কথা। তৃণমূল সরকার থাকলে পশ্চিমবঙ্গের হিস্যা বাড়ানোর দাবি উঠত। বিজেপি সরকার কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে চলবে বলে ঢাকা আশা করছে, দরকষাকষি কম হবে।

এছাড়া ফেনী নদীর ১.৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার নিয়েও সমঝোতা স্মারক দ্রুত চুক্তিতে রূপ নিতে পারে।
৪. ‘ইফতার কূটনীতি’র কী হবে?  
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার প্রতি বছর কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের সঙ্গে ইফতার পার্টি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখত। বিজেপি আমলে এই ‘সফট ডিপ্লোম্যাসি’ কমে যেতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
ঢাকার প্রতিক্রিয়া  
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা পশ্চিমবঙ্গের জনগণের রায়কে স্বাগত জানাই। তিস্তা চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চাই। একই সঙ্গে আমরা আশা করি, নতুন সরকার সীমান্তে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখবে।”
এরপর কী?  
১. নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে? শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার নাকি কেন্দ্র থেকে কেউ – এই প্রশ্নে জল্পনা তুঙ্গে।  
২. প্রথম ঢাকা সফর: নতুন মুখ্যমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর ঢাকা হলে তিস্তা নিয়ে ইতিবাচক বার্তা আসবে।  
৩. চীনের ফ্যাক্টর: তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের অর্থায়নের প্রস্তাব আছে। ভারত চায় নিজেরাই করতে। বিজেপি সরকার দ্রুত চুক্তি করে চীনের প্রবেশ বন্ধ করতে চাইবে।

বিশ্লেষণ: পশ্চিমবঙ্গের এই ফলাফল বাংলাদেশের জন্য ‘সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ’ দুটোই নিয়ে এসেছে। তিস্তার দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে CAA-র মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে নতুন করে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে বর্তমান সরকারকে।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url